আষাঢ়ের বৃষ্টিতে হুগলিতে বেড়াতে গেলাম কলকাতা থেকে। কিভাবে যেতে হবে খুব সুন্দর করে
বলে দিলেন প্রদীপদা আর কমলদা। সুতরাং আমার সমস্যা হবার কথা নয়, তবুও পণ্ডিতি করে
একটা ট্যাক্সি নিলাম হাওড়ার উদ্দেশ্যে..দেখি পথ আর শেষ হয় না। হাওড়ার ব্রিজটা আসলে দেখার মত।
হাওড়ার রেল স্টেশনে কাউন্টার খুঁজে একটা ব্যান্ডেল হগলির টিকেট কাটলাম,
বললো দৌড়ে যান ট্রেনটা ছেড়ে যাবে ৪ নম্বর থেকে। এখন আমি হলাম নবাগত, ৪ নং
প্ল্যাটফরম খুজে পেতেই ট্রেন ছেড়ে দিল, ট্রেন মিস করলাম। পরের ট্রেন কখন
আসবে জানার জন্য যাকেই জিজ্ঞাসা করি কেউই বলার সময় পাচ্ছে না। এতোই
ব্যস্ততা সবার ওখানে, বিশেষ করে চাকুরীজীবীরা ওখানে খুবই
ব্যতিব্যস্ত...মৌমাছির ঝাকের মত শুধুই উড়ছে।
তা ছাড়া কুলি, সুইপার ওরাও
কোন সহযোগিতা করছে না। পড়লাম ভীষণ বিপদে, এক দোকানদারের কাছে জানতে চাইলাম
, উনি বললেন ওই যে মাইকে বলছে আপনি শুনুন।
যাক অপশেষে জানতে পারলাম
পরের ট্রেন আসবে ৫ নম্বরে...আমি ৫ নম্বরের কাছে দাঁড়িয়ে ভাবছি কোন লাইনে
আসবে? ২টা লাইন আছে। পানি কিনতে হবে, যাব কিনা ভাবছি...গেলে যদি ট্রেন মিস
করি ভাবতেই হুস করে ট্রেন চলে এলো.....গাদা গাদা মানুষ নামলো আগের মতই
....হাজারে হাজারে।
যাক একটা খালি কম্পার্টমেন্টে উঠৈ পড়লাম জানালার কাছে। পরপর দেখালাম পুরো ট্রেনই ভরে গেল নিমেষে, এবং হুইসেল দিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিল।
বিভিন্ন হকার নানান জিনিষ বিক্রি করছে, একজনের কাছ থেকে মিষ্টি বাদাম
কিনলাম। সামনের সহযাত্রী ঝালছোলা কিনলো দুজনেই খাচ্ছি, ভাবলাম পানি পিপাসা
পেলে উপায় নেই। সামনের লোক ব্যাগ থেকে পানি বের করে খেলেন, আমাকে জিজ্ঞাসা
করলেন খাবেন? আমি হেসে দিলাম এবং খেলাম। উনি জানতে চাইলেন কোথায় যাব,
কোত্থেকে এসেছি। কথা প্রসঙ্গে জানলাম উনি দিল্লির মানুষ, ব্যবসায়ী।
বাংলাদেশে যাবার খুব ইচ্ছা আছে ব্যবসার জন্য।
যাক প্রায় ২ ঘন্টার পর
হুগলিতে নামলাম, দেখলাম খুব একটা যাত্রী সেখানে নামে নি। এক দোকানে দাঁড়িয়ে
চা খেলাম, ২০ টাকা কেজি আম্রপালি আম দেখে কিনে ফেললাম...আসলে আম আমার খুবই
পছন্দের ফল। ওপার থেকে ওভারব্রিজে এপাড়ে এলাম , কমলদার কথামতো একটা রিক্সা
নিয়ে তার দেয়া ঠিকানায় পৌঁছে গেলাম নির্বিঘ্নেই। দেখলাম একরাশ উষ্ণতা নিয়ে
দাদা -বৌদি অপেক্ষা করছেন।
২৪ থেকে ২৬ তারিখ দাদার ওখানে ছিলাম,
একবারও মনে হয় নি আমি ফেসবুকের কোন অচেনা মানুষের বাসায় আছি...কোথায় যেন
একটা আত্মীয়তার সূত্র আমাদের ভেতর কাজ করে....মূল সুর হলো আমরা বাঙ্গালী,
আর কমলদা বা বৌদির পূর্বসুরীরা একসময় এদেশ ছেড়ে ওদেশে যেতে বাধ্য হয়েছেন
রাষ্ট্র/ধর্ম নামক এই গোলকধাঁধার চোরাবালিতে। যা আজো তাদের ভেতর কাজ করে,
আজো বাংলাদেশি কাউকে দেখলে তাদের ভেতর গভীর এক মমত্ব কাজ করে। কত কিছুই না
ওনারা আমাকে খাইয়েছেন...সেটা আর নাই বললাম। যদিও বাংলাদেশিদের ভেতর ধারনা
কলকাতার মানুষ খুব হিসেবি, আমার কিন্তু তা কখনোই মনে হয়নি। প্রদীপদা আমি
ওদেশে গেলে যা করেন তা বাংলাদেশি কেউই তেমন করেন না, কমলদার আতিথেয়তাও
সত্যি দেখার মতন, আমি আপ্লুত তাদের ভালবাসায়।
ঐতিহাসিক ব্যান্ডেল
চার্চ দেখাতে নিয়ে গেলেন , চুচূড়া যেতে পথে দেখলাম আরেকটা ঐতিহাসিক
হাসপাতাল, সময়াভাবে সেখানে ঢুকতে পারলাম না। বৃষ্টি কিন্তু সারাদিনই টিপটিপ
করে ঝরছিল...কিন্তু বেড়ানো তার জন্য বন্ধ হয়নি আমাদের। চুচুড়া মার্কেটে
জিনিষপত্রের দাম দেখলাম কলকাতার চেয়ে অনেক সস্তা ও কোয়ালিটির।
সবচেয়ে
উল্লেখযোগ্য যে বিষয়গুলো আমাকে মুগ্ধ করেছে তা হলো...তাদের অকৃত্রিম
ভালবাসা। উন্নত ও সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা, ভাড়াও কম , গ্যাসের সিলিণ্ডার
অনেক সস্তা, মাছ বা মাংস চয়েস করে টাটকা কেটে কেনা যায় , তাতে নিজের
আয়ত্বের ভেতরেই কেনা যায়। যা আমাদের ইচ্ছা থাকলেও কিনতে পারি না শুধু এই
সিস্টেমের অভাবে।